• বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন

অপরাধের জালে টেকনাফ: দায় কার?

সামিরা আক্তার / ২৮৯ বার পড়া হয়েছে
আপডেট সময় : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬

টেকনাফে অপরাধের বিস্তার: নিরাপত্তা সংকট নাকি সামাজিক অবক্ষয়?

অভিমত 

সামিরা আক্তার 

কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী জনপদ টেকনাফ। একদিকে নাফ নদী, অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্ত-ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই মাদক, মানবপাচার ও নানা অপরাধের ঝুঁকিতে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও কঠোর আইনের পরও মাদক চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। বরং অপরাধের ধরন বদলে নতুন নতুন কৌশলে সক্রিয় হচ্ছে চক্রগুলো। প্রশ্ন উঠছে-এটি কি কেবল নিরাপত্তার সংকট, নাকি এর পেছনে কাজ করছে গভীর সামাজিক অবক্ষয়ও?

টেকনাফের অপরাধজগতের সবচেয়ে বড় সমস্যা মাদক। সীমান্তের ওপার থেকে নানা কৌশলে মাদক দেশে ঢোকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় পর্যায়ে একটি অংশ এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করলেও বহন ও পরিবহনের কাজে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নাফ নদী ও সীমান্তবর্তী এলাকায় জেলেদের আড়ালে মাদক পরিবহনের মতো কৌশল নিয়েও নানা সময়ে আলোচনা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো:আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রতিদিন যে পরিমাণ মাদক ধরা পড়ছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মাদক কীভাবে দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছে যাচ্ছে? তাহলে কি নজরদারির কোথাও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে? নাকি এই ব্যবসার পেছনে এমন প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে?

মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনো কোনো অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর। কারণ সীমান্তের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেউ যদি অপরাধীদের সহযোগিতা করে, তাহলে শুধু একটি মাদক চালান নয়-পুরো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনা জরুরি।

আরেকটি ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, অভিযানে অনেক সময় বাহক বা ছোটখাটো কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও মূলহোতারা থেকে যায় আড়ালে। ফলে একজন ধরা পড়লেও অন্যজন তার জায়গা নেয়। এভাবে অপরাধের মূল শেকড় অক্ষত রেখে শুধু বাহকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও। অল্প সময়ে অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থের মালিক হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের বিলাসী জীবনযাপন তরুণদের একটি অংশকে বৈধ ও পরিশ্রমনির্ভর জীবনের প্রতি নিরুৎসাহিত করতে পারে। যখন সমাজে সৎ উপার্জনের চেয়ে অবৈধ অর্থের দাপট বেশি দৃশ্যমান হয়, তখন নৈতিকতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

এর প্রভাব বাজার ও সামাজিক সম্পর্কেও পড়তে পারে। অবৈধ অর্থের প্রবাহ স্থানীয় অর্থনীতিতে কৃত্রিম চাপ তৈরি করলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে থাকলে অপরাধীরা একসময় সমাজের ভেতরেই নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির সুযোগ পায়। এখানেই সামাজিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় বিপদ।

তাই টেকনাফের মাদক সমস্যা মোকাবিলায় শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৌশল। সীমান্তে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত রোটেশন, জবাবদিহি ও দুর্নীতির অভিযোগে কঠোর তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

অপরাধীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করাও জরুরি। কোনো মাদক কারবারি যেন অর্থের প্রভাব খাটিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের জায়গা দখল করতে না পারে, সে বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সচেতনতা ও কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

তবে শুধু শাস্তি দিয়ে মাদক সমস্যা নির্মূল করা যাবে না। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-টেকনাফের মানুষকে অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া সীমান্তের এই জটিল অপরাধচক্র ভাঙা কঠিন।

টেকনাফকে শুধু ‘মাদকের জনপদ’ হিসেবে পরিচিত করা যাবে না। এই জনপদে বিপুলসংখ্যক সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ রয়েছেন, যারা নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবন চান। তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু মাদক জব্দ বা আসামি গ্রেপ্তার নয়; এর অর্থ হলো একটি প্রজন্মকে অপরাধের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনা।

সময় এসেছে প্রশ্ন করার-টেকনাফে অপরাধ বাড়ছে কেন? শুধু সীমান্তের দুর্বলতা, নাকি আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থারও কোথাও ফাটল ধরেছে? উত্তর খুঁজতে হবে এখনই। কারণ মাদক ও অপরাধের শেকড় যত গভীরে যাবে, তা উপড়ে ফেলা তত কঠিন হবে।

সামিরা আক্তার

(MSS) চট্টগ্রাম কলেজ ।

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এজাতীয় আরো সংবাদ দেখুন
error: Content is protected !!
https://slotbet.online/
error: Content is protected !!